top of page

রথ, জগন্নাথ-- সবই জানেন, বাকিটা জানেন কি?

রথ, জগন্নাথ-- সবই জানেন, বাকিটা জানেন কি?

তখন দ্বাপর যুগ। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর অনেকদিন কেটে গেছে। দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণ একদিন গাছের নীচে বসে থাকাকালীন তাঁর রাঙা চরণকে পাখি ভেবে ভুল করে বাণ মারে জরা নামে এক শবর। শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর খবর পেয়ে অর্জুন ছুটে এলেন দ্বারকায়। দেহ সৎকারের সময় অর্জুন দেখলেন,গোটা দেহটা পুড়লেও নাভিদেশ পুড়ছে না! তখনই হয় দৈববাণী, ‘ইনিই সেই পরমব্রহ্ম। অর্জুন, এঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো। সমুদ্রেই ওঁর অনন্তশয়ন।’ অর্জুন তাই করলেন।ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল পরমব্রহ্ম সেই নাভি। আর তাঁকে লক্ষ করে সমুদ্রের তীর ধরে ছুটে চললেন সেই শবর, যার বাণে মৃত্যু হয়েছে শ্রীকৃষ্ণে। দ্বারকা থেকে পুরী পর্যন্ত ছুটে অবশেষে সেখানেই শ্রীকৃষ্ণকে স্বপ্ন দেখলেন তিনি, তাঁর স্বপ্নে দেখা দিয়ে কৃষ্ণ বলেন,‘কাল ভোরে আমাকে তুলে নে। এখন

থেকে তোর বংশধর শবরদের হাতেই পুজো নেব আমি’। সেই থেকে নীলমাধব রূপে তিনি পূজিত হতে থাকলেন শবরদের কাছে।





এরপর এলো কলি যুগ। কলিঙ্গের রাজা তখন ইন্দ্রদ্যুম্ন দেব। বিষ্ণুর ভক্ত ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীক্ষেত্রে একটি মন্দির গড়ে তুললেন। এখন আমরা তাকে চিনি জগন্নাথধাম রূপে। কিন্তু সেই মন্দিরে তখন বিগ্রহ নেই! রাজসভায় একদিন কথা প্রসঙ্গে তিনি জানতে পারলেন বিষ্ণুরই এক রূপ নীলমাধবের কথা। অমনি চারদিকে লোক পাঠালেন রাজা। বাকিরা খালি হাতে ফিরে এলেও, ফিরলেন না বিদ্যাপতি। তিনি জঙ্গলের মধ্যে পথ হারালে তাঁকে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি নিয়ে এলেন শবর রাজ বিশ্ববসুর কন্যা ললিতা। ললিতার প্রেমে পড়লেন বিদ্যাপতি।বিয়ে হল দু-জনের। বিয়ের পর বিদ্যাপতি দেখলেন রোজ



সকালেই শবররাজ কয়েক ঘণ্টার জন্য কোথাও যান। রোজ সকালে কোথায় যান বিশ্ববসু! স্ত্রীকে প্রশ্ন করে বিদ্যাপতি জানতে পারলেন যে জঙ্গলের মধ্যে একটি গোপন জায়গায় নীলমাধবের পূজো করতে যান শবররাজ বিশ্ববসু।উত্‍সাহিত হয়ে উঠলেন বিদ্যাপতি। নীলমাধবের সন্ধান যখন পাওয়া গিয়েছে, তখন আর ছাড়া যাবে না বলে ঠিক করলেন তিনি। নীলমাধবকে দর্শন করার বায়না ধরলেন তিনি। বিশ্ববসু প্রথমে bরাজি না হলেও অবশেষে মত দিলেন। তবে শর্ত দিলেন যে বিগ্রহ পর্যন্ত চোখ বেঁধে যেতে হবে বিদ্যাপতিকে। জামাতা

হলেও বিদ্যাপতিকে কোনও ভাবে নীলমাধবের সন্ধান দিতে রাজি ছিলেন না তিনি। তাতেই রাজি বিদ্যাপতি। চোখ বাঁধা অবস্থায় যাওয়ার সময় তিনি গোটা পথে সরষের দানা ছড়াতে ছড়াতে গেলেন।

যথাস্থানে পৌঁছে যখন তিনি দর্শন পেলেন নীলমাধবের, তখন তাঁর প্রাণ আনন্দে ভরে উঠল। বনের মধ্যে পূজোর ফুল কুড়িয়ে এনে বিশ্ববসু যখন পূজোয় বসলেন, অমনি দৈববাণী হল, ‘এতদিন আমি দীন-দুঃখীর পূজো নিয়েছি, এবার আমি মহাউপাচারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পূজো নিতে চাই।’


ভীষণ রেগে গেলেন শবররাজ। ইষ্টদেবতাকে হারাবার দুঃখে বন্দি করলেন বিদ্যাপতিকে। কিন্তু কন্যা ললিতার বারবার কাকুতি মিনতিতে বাধ্য হলেন জামাতাকে মুক্ত করতে। বিদ্যাপতিও সঙ্গে সঙ্গে এই খবর পৌঁছে দিলেন রাজার কাছে। ইন্দ্রদ্যুম্ন মহানন্দে জঙ্গলের মধ্যে সেই গুহায় পৌঁছে গেলেন নীলমাধবকে সাড়ম্বরে রাজপ্রাসাদে আনতে। কিন্তু একি, নীলমাধব কোথায়! আটক হলেন শবররাজ। তখন দৈববাণী হল যে সমুদ্রের জলে ভেসে আসবে কাঠ। সেই থেকেই বানাতে হবে বিগ্রহ। হাজার হাজার হাতি,ঘোড়া, সেপাই, লোক-লস্কর নিয়েও সমুদ্র থেকে তোলা গেল না সেই কাঠ।



শেষে কাঠের একদিক ধরলেন শবররাজ আর একদিক ব্রাহ্মণ পুত্র বিদ্যাপতি। জগন্নাথের কাছে ব্রাহ্মণ-শবর কোনও ভেদাভেদ নেই যে! মহারাজ তাঁর কারিগরদের লাগালেন মূর্তি গড়তে। কিন্তু

সেই কাঠ এমনই পাথরের মত শক্ত যে ছেনি, হাতুড়ি সবই ভেঙে যায়। তা হলে উপায়! মূর্তি গড়বে কে?

মহারাজের আকুলতা দেখে বৃদ্ধের বেশে হাজির হলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। তিনিই গড়বেন মূর্তি। তবে শর্ত একটাই। ২১ দিন আগে তিনি নিজে দরজা না খুললে কেউ যেন তাঁর ঘরে না আসে।শুরু হল কাজ। ইন্দ্রদ্যুম্নের রানি গুন্ডিচা রোজই রুদ্ধ দুয়ারে কান পেতে শোনেন কাঠ কাটার ঠক্ ঠক্ শব্দ। ১৪ দিন পর হঠাৎ রানি দেখলেন রুদ্ধদ্বার কক্ষ নিস্তব্ধ। কী হল! কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে রাণি মহারাজকে জানাতেই ইন্দ্রদ্যুম্ন খুলে ফেললেন কক্ষের দরজা। ভেতরে দেখেন বৃদ্ধ কারিগর উধাও, পড়ে আছে তিনটি অসমাপ্ত মূর্তি। তাদের হাত, পা কিছুই গড়া হয় নি। গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন ভেবে দুঃখে ভেঙে পড়লেন রাজা। তখন তাঁকে স্বপ্ন দিয়ে জগন্নাথ বললেন যে এরকম আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। তিনি এই রূপেই পূজিত হতে চান।



সেই থেকেই শ্রী জগন্নাথদেবের মূর্তি ওভাবেই পূজিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। জগন্নাথের প্রধান উৎসব হল রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ বোন সুভদ্রা ও দাদা বলরাম বা বলভদ্রকে নিয়ে রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচারবাড়ি যান। সেখান থেকে সাতদিন পরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাওয়াটাকেই জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে। রথের দিন তিনটি রথ পর পর যাত্রা করে মাসির বাড়ি। প্রথমে যায় বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং সবশেষে জগন্নাথের রথ। রথে চড়ে এই গমন ও প্রত্যাগমনকে (সোজা) রথ এবং উল্টোরথ বলে।


বাংলায় রথযাত্রা সংস্কৃতির সম্ভবত সূচনা হয়েছিল শ্রীচৈতন্যদেবের নীলাচল অর্থাৎ পুরী যাওয়ার পর।চৈতন্যভক্ত বৈষ্ণবরা বাংলায় পুরীর অনুকরণে রথযাত্রার প্রচলন করেন। যাত্রা শব্দেরঅর্থ গমন। তাই জগন্নাথের রথযাত্রা এবং উল্টোরথ হিন্দু-বাঙালিদের কোনও কাজ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সূচনার


পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজোর সূচনাও হয় এই রথ কিংবা উল্টোরথের দিন।

45 views1 comment

1件のコメント

5つ星のうち0と評価されています。
まだ評価がありません

評価を追加
ゲスト
2023年6月27日
5つ星のうち5と評価されています。

Good information

いいね!
bottom of page